হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ)

ইসলামের প্রথম খলিফা; অপর নাম ‘আতীক’ । হাদিসে ইহার নানারূপ ব্যাখ্যা আছে । তাহার প্রকৃত নাম ছিল আব্দুল্লাহ্‌ । তাহার পিতা উসমান, অন্য নাম আবু কুহাফা ও মাতা উম্মুল খায়র সাল্‌মা বিনতে সাখ্‌র । উভয়ই মক্কার কা’ব ইবন সা’দ ইবন তায়ম ইব্‌ন মুর্‌রা পরিবারের লোক । প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী আবু বাকর (রাঃ) এর বয়স ছিল হযরত (সঃ) এর চেয়ে তিন বৎসর কম । তিনি ছিলেন মক্কার একজন ধনবান বনিক ও হযরত (সঃ) এর প্রাচীনতম সমর্থকদের অন্যতম । অনেকের মতে পুরুষদের মধ্যে তিনিই প্রথম মুসলমান । তাহার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হইল ইলাহী প্রত্যাদেশ (ওয়াহি) এর নির্বাচিত মাধ্যম বলিয়া হযরত (সঃ) এর প্রতি তাহার অটল বিশ্বাস । হযরত (সঃ) এর  মিরাজের বিবরণ শুনিয়া কেহ কেহ সন্দেহ প্রকাশ করে । হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পর্কে হযরত (সঃ) এর আচরণ কিভাবে গ্রহণ করিবে অনেকেই বুঝিতে পারিতেছিল না । কিন্তু হযরত (সঃ) এর উপর আস্থায় আবু বকর (রাঃ) তখনও ছিলেন অবিচল । ইবন ইসহাক এর মতে, এই অবিচল বিশ্বাসের দরুনই তিনি “আস-সিদ্দিক” উপাধি প্রাপ্ত হন । ইসলামের ঐতিহাসিক বিবরণগুলির আদ্যান্ত এই উপাধি তাহার নামের সহিত জড়িত রহিয়াছে । তিনি ছিলেন নম্র প্রকৃতির লোক । কুরআন পাঠের সময় তাহার অশ্রু নির্গত হইত । তাহার কন্যা বলিয়াছেন, হিজরতের সময় হযরত (সঃ) এর সঙ্গে যাইতে পারিবেন শুনিয়া তিনি আনন্দে ক্রন্দন করেন । তিনি ছিলেন সরল ও চিন্তাশীল ।

হযরত (সঃ) এর শিক্ষার বিশুদ্ধ নৈতিক উপদেশসমূহ তাহার মনে তীব্র অনুভূতি জাগায় । বহু ক্রীতদাস খরিদ করিয়া মুক্তিদান ও অন্যান্য অনুরূপ কার্যদ্বারা তিনি ইহার প্রমাণ দেন । ইসলামের খাতিরে কোন আত্মত্যাগই তাহার নিকট খুব বড় বলিয়া মনে হইত । ইহার ফল এই দাঁড়ায় যে, তাহার ৪০ হাজার দিরহাম মূল্যের সম্পত্তির মধ্যে তিনি মদিনায় মাত্র ৫ হাজার দিরহাম লইয়া যাইতে সমর্থ হন । ভীষণতম বিপদের মধ্যেও তিনি বিশ্বস্ততার সহিত তাহার বন্ধু ও শিক্ষকের পার্শ্বে দন্ডায়ান থাকেন । সর্বাপেক্ষা সংকটময় সময়ে যে অত্যল্প সংখ্যক লোক আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন নাই, তিনি ছিলেন তাহাদের মধ্যে অন্যতম । বানু হাশিমকে মক্কা সমাজ হইতে বহিষ্কৃত করা হইলে তখনকার মত কেবল একবার তিনি বিচলিত হন বলিয়া কথিত আছে । তজ্জন্য তিনি মক্কা ত্যাগ করেন ; কিন্তু জনৈক প্রতিপত্তিশালী মক্কাবাসীর আশ্রয়ে শীঘ্রই ফিরিয়া আসেন । তাহার অই রক্ষক তাহাকে নিঃসঙ্গ অবস্থায় ত্যাগ করিলেও তখনও তিনি মক্কা শহরে অবস্থান করেন । তাহার জীবনের চরম গৌরবের দিন আসে যখন হযরত (সঃ) মদিনায় হিজরত করার সময় তাহাকে স্বীয় সঙ্গী হিসেবে মনোনীত করেন । আল্লাহ্‌ তাআলা আল-কুরআনে “দুই জনের মধ্যে দ্বিতীয়” (সুরা ৯: আয়াত ৪০) আখ্যায় তাহার নাম অমর করিয়া এই আত্মত্যাগী মহান ভক্তকে পুরস্কৃত করেন । পুত্র আব্দুর রহমান ব্যতীত তাহার পরিবারের অন্যান্য সদস্যও মদিনায় হিজরত করেন; আব্দুর রাহমান কাফির থাকা অবস্থায় বদরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অংশ নেন । পরিশেষে তিনিও ইসলামে দীক্ষিত হইয়া মদিনায় হিজ্রাত করেন । এই নূতন আবাসে আল-সুনুহ্‌ শহরতলীতে আবু বাকর (রাঃ) অনাড়ম্বর গৃহাস্থালী স্থাপন করেন । হিজ্রাতের পূর্বে ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে হযরত(সঃ) তাহার কন্যা আইসার (রাঃ) পাণি গ্রহণ করিয়াছিলেন । এই বিবাহের মাধ্যমে উভয়ের বন্ধন আরো দৃঢ় হয় । আবু বাকর (রাঃ) প্রায় সর্বদাই হযরত (সঃ) এর সঙ্গে থাকিতেন এবং তাহার সমস্ত অভিযানে তিনি তাহার সঙ্গে গমন করেন । পক্ষান্তরে তাহাকে কদাচিৎ সামরিক অভিযানের পরিচালক নিযুক্ত করা হইত । তাবূক অভিযানে তাহার উপর পতাকা ধারণের ভার অর্পিত হয় । কিন্তু নবম হিজরিতে (৬৩১ খৃঃ) হযরত (সঃ) তাহাকে হাজ্জ পরিচালনা করিতে আমীরুল হাজ্জ হিসাবে মক্কায় প্রেরণ করেন । হাদিছের বর্ননানুসারে এই উপলক্ষে আলী (রাঃ) কাফিরদের সহিত সম্পর্কচ্ছেদের আয়াত পাঠ করিয়া শোনান । হযরত (সঃ) অসুস্থ হইয়া পড়িলে তৎপরিবর্তে আবু বাকর (রাঃ) এর উপর মসজিদে নাববির জামা’আতে ইমামাত করার ভার ন্যস্ত হয় । ৮ই জুন ৬৩২ খৃঃ হযরত (সঃ) এর ওফাত হইলে উমার (রাঃ) ও তাহার বন্ধুগণ আবু বাকর (রাঃ) এর এই সম্মানের ভিত্তিতে মুসলিম সমাজের প্রধানরূপে তাহার নাম প্রস্তাব করেন । তিনি কোনরূপেই সমাজে কোন নূতন ধারনা বা নীতির প্রবর্তন করেন নাই । তিনি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর চতুস্পার্শে যে সকল প্রতিভা সমবেত হন, তাহাদিগকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সমর্থ হন । সরল অথচ দৃঢ় চরিত্র বলে তিনি হযরত (সঃ) এর প্রতিরূপ বলিয়া প্রতিপন্ন হন । সর্বাপেক্ষা কঠিন ও বিপজ্জনক সময়ে নবীন মুসলিম সমাজের পরিচালনা করেন এবং মৃত্যুকালে উহাকে এত মজবুত ও দৃঢ় অবস্থায় রাখিয়া যান যে, উহা শক্তিশালী ও প্রতিভাবান উমার (রাঃ) এর খিলাফাত পরিচালনার পথ সুগম করে ।

প্রথমে তিনি হযরত (সঃ) এর ওফাতের পর আরবের আশঙ্কাজনক অবস্থা সত্ত্বেও যুবক উসামা এর অধীনে জর্ডান নদীর পূর্বাঞ্চলে পূর্ব নির্ধারিত একটি অভিযান প্রেরণ করিয়া হযরত (সঃ) এর আদেশের প্রতি পূর্ন আনুগত্যের প্রমাণ দেন । ইতিমধ্যে চতুর্দিকস্থ জনপদের গোত্রগুলি মদিনার রাজনৈতিক প্রাধান্যের বিরুদ্ধে মাথা তুলিতে আরম্ভ করে । আবু বাকর (রাঃ) তাহাদের যাকাত নাকচের দাবী প্রত্যাখ্যান করেন । উসামা বাহিনী স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিলে তিনি জুল কাস্‌সার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন এবং প্রতিভাশালী সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে আবু বাকর (রাঃ) সেনাদলের পরিচালক নির্বাচন করেন । খালিদ আসাদ ও ফাযার কে আল বুযাখা তে পরাজিত ও তামীম গোত্রকে পদানত করেন । পরিশেষে জান্নাতুল মাওত এ আল আক্‌রাবা এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বানু হানীফাকে ইসলামী শক্তির অধীনে আনয়ন করেন । যুদ্ধে তাহার এই সাফল্যের দরুন অন্য সেনাপতিদের পক্ষে বাহ্‌রায়ন ও উমানের বিদ্রোহ দমন সম্ভবপর হয় । পরিশেষে ইক্‌রিমা ও আল মুহাজির ইয়ামান ও হাদ্‌রামাওত পুনরায় মদীনা রাষ্ট্রের অধীনে আনয়ন করেন । হযরত (সঃ) এর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া আবু বাকর (রাঃ)  পরাজিত গোত্রগুলির সহিত সদয় ব্যবহার করেন এবং এইভাবে রাজ্যে পুনরায় শান্তি স্থাপন করেন । এক বৎসরেরও কম সময়র মধ্যেই আরব ভূমিতে অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইলে তিনি খালিদ ও অন্যান্য পরীক্ষিত সেনাপতিগণকে রোমক ও পারসিকদের পুনঃ পুনঃ ইসলামী রাষ্ট্রে আক্রমণ রোধ করার জন্য পারস্য ও বায়যান্টিয়াম সম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন ।

স্বল্পকালীন শাসনকালের মধ্যেই আবু বাকর (রাঃ) উভয় রণাঙ্গনে আরব বাহিনীর প্রথম বিরাট বিজয় দর্শনে পরিতোষ লাভ করেন । পারস্যের আল-হীরা বিজিত হয় ৬৩৩ খৃঃ শেষোক্ত সফলতার অল্প পরেই ১৩ হিঃ ২২ জুমাদা’ছ ছানী/১৩ আগস্ট, ৬৩৪ খৃ তিনি শেষ নিঃশাস ত্যাগ করেন । হযরত (সঃ) এর পার্শে তাহাকে কবর দেওয়া হয় । তাহার স্বল্পকাল ব্যাপী নেতৃত্বে প্রধানত যুদ্ধেই অতিবাহিত হয় । কাজেই তখন সাধারণ জীবন যাত্রায় কোন যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচিত হয় নাই । কুরআন সংরক্ষণে তাহার অবদান অন্য অধ্যায়ে বর্নিত হবে । খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পরো তিনি অনাড়ম্বরভাবে প্রথমে আস্‌ সুনহস্থিত তাহার স্বগৃহেই বাস করিতেন । পরে দূরত্বের দরুন কাজের অসুবিধা হওয়ায় শহরের মাঝে সরিয়া আসেন । তাহার বিনয় এবং রাষ্ট্রের অর্থে নিজে অর্থশালী হওয়ার প্রতি তাহার বিতৃষ্ণা সম্পর্কে হাদিছে বহু বর্ননা রহিয়াছে । ইহাতে তাহার চেহারারও সুন্দর বর্ণনা রহিয়াছে । তাহার ঢিলা ঢলা পোশাকে উপেক্ষার চিহ্ন সুপরিস্ফুট ছিল । তাঁর মুখমণ্ডল ছিল কিঞ্চিত অপ্রশস্ত, কপাল ছিল উচ্চ, চক্ষুদ্বয় কোটরাগত, চুল অকাল্পক্ক এবং শ্মশ্রু মেহেদী রঞ্জিত । তাহার সরু হাতের রোগগুলি গিরাময় হইয়া ফুলিয়া থাকিত । বিভিন্ন উপলক্ষে তিনি যে সকল বক্তৃতা দেন, তাহার কতকগুলি ইতিহাসে রক্ষিত আছে । এই সকল বক্তৃতা হইতে তাহার চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব উপলদ্ধি করা যায় । (সূত্রঃ সংক্ষিপ্ত ইসলামিক বিশ্বকোষ- ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s